August 13, 2026, 2:19 pm
আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ আঃ সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীদের একটি অন্যতম আপত্তি হলো তিনি নিজেকে একেকবার একেকটা দাবী করেছেন কেন? সব দাবি একত্রে কেন করেননি?
উত্তর আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিরুদ্ধবাদী মোল্লা মৌলভীগণ এই বলে খুব তোষামোদ করে যে, “মির্যা সাহেব প্রথমে নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করলো, তারপর নিজেকে ঈসা দাবি করলো, তারপর নবী দাবি করলো, তারপর দাবি করলো কৃষ্ণ, তারপর দাবি করলো বুদ্ধ, তারপর সারাবিশ্বের সব ধর্মের নবীগণের প্রতিচ্ছায়া দাবি করলো! এক মির্যা সাহেব সবকিছু হয়ে গেল!” তাদের এই তোষামোদের কারণ এই যে, তারা ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা ইতিহাস বিশ্লেষণ করেনা।
খাতামান্নাবিয়্যিন হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনীর দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই তিনি একত্রে সব দাবি করেননি। তিনি ধাপে ধাপে দাবিগুলো করেছেন। তিনি প্রথমে তাঁর নিজ গোত্র কুরাইশদের নবী হবার দাবি করেছেন এবং তাদেরকে এক পাহাড়ের সামনে নিয়ে গিয়ে তার নবুওয়তের ব্যাপারে জানিয়েছেন যার ঘটনা আমরা সুরা লাহাবের শানে নুযুল হতে জানতে পারি। তিনি যখন তাঁর গোত্রকে নিজ দাবি সম্পর্কে অবহিত করলেন তখন আবু লাহাব উঠে দাড়িয়ে রেগেমেগে তাকে অভিশম্পাত করে বসে ও সুরা লাহাব নাযিল হয়! কুরাইশদের আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষে নবুওয়তের প্রথমদিকের সুরাগুলো যেমন সুরা ফীল, সুরা কুরাইশ এগুলো অবতীরণ হয়। উক্ত সুরাগুলোতে কুরাইশদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা তাদের স্মরণ করিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে ডাকা হয়।
তারপর তিনি মক্কায় বসবাসকারী পৌত্তলিকগণের নবী হবার দাবি করেন এবং পৌত্তলিক নেতারা তাঁর চাচা আবু তালিবের নিকট এসে তাঁর ব্যাপারে নালিশ করে ও শুধুমাত্র ”তাদের মূর্তিগুলো মিথ্যা” একথা হতে বিরত থাকার অনুরোধ করে। বিনিময়ে তাঁর জন্য অত্যন্ত লোভনীয় বেশ কয়েকটি প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু মুহাম্মদ সাঃ এসব প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, “আমার ডানপাশে সূরয এবং বামপাশে চন্দ্র এনে দাড় করিয়ে দিলেও আমি সত্য প্রচার হতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবো না। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় পৌত্তলিকদের মুখালেফাত তথা বিরোধিতা…
তারপর তাঁর দাবি যখন আহলে কিতাবগণ জানতে পারে তখন তিনি তাদের জন্যও রাসুল হবার দাবি করেন এবং পরিশেষে তিনি সারা বিশ্বের মানবজাতির জন্য রাসুল হিসেবে দাবি করেন- “ইয়া আইয়্যুহান্নাসু ইন্নি রাসুলুল্লাহে ইলাইকুম জামিয়া… অর্থাৎ হে মানবজাতি, নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার জন্য রাসুল” এখন আমাদের বিরুদ্ধবাদীগণকে প্রশ্ন, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ যেখানে ধাপে ধাপে দাবি করেছেন সেখানে মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব ধাপে ধাপে দাবি করাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? নাকি হযরত মুহাম্মদ সাঃ ধাপে ধাপে দাবি করেছেন বলে তিনি মিথ্যা দাবিকারক?(নাউযুবিল্লাহ) প্রকৃতপক্ষে হযরত মুহাম্মদ সাঃ এবং হযরত মির্যা গোলাম আহমদ আঃ উভয়ের ধাপে ধাপে দাবি করার পিছনে একই ব্যাপার কাজ করেছে যা এখানে উল্লেখ করা হলো- যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো দাবি করে যার ফলে তার ওপর লোকে পাথর মারা শুরু করে আর সে যদি মিথ্যা হয় তবে সে তার দাবি ফিরিয়ে নেয় নাকি আরো বড় দাবি করে বসে? অবশ্যই সে বড় দাবি করে না বরং সে তার দাবি ফিরিয়ে নেওয়ার ধান্দা করবে যদি সে মিথ্যা দাবিকারক হয়। এটা আমরা বাস্তবিকই দেখি যে, কেউ যদি প্রকাশ্যে এমন কোনো দাবি করেও বসে যা প্রকৃতপক্ষে সে নয় সেক্ষেত্রে সে তওবা করে এবং তার দাবি হতে ফিরে আসে।
মিথ্যাবাদী কেউ কখনো আর যাইহোক এমন কোনো দাবি করবেনা যার ফলে তার কপালে লোকের দ্বারা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ঘটার আশঙ্কা থাকবে। আল্লাহর সত্য নবীগণই কেবলমাত্র দাবি করার পর মুখালেফাত(বিরোধিতা) এর সম্মুখীন হয় এবং সামনে এগিয়ে যায়। তাদের মুখালেফাত তাদের সত্যতার সাক্ষী হয় যে তারা পিছপা হয়না। রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ সাঃ যখন কুরাইশদের নবী হবার দাবি করেন তখন তাঁর গোত্র তাঁর বিরোধি হয়ে উঠে। যদি তিনি মিথ্যা দাবিকারক হতেন তবে তিনি কখনোই পরবর্তীতে এরচে বড় দাবি করতেন না। কিন্তু তিনি এর পরবর্তী দাবিগুলোর মাধ্যমে প্রথমে পুরো মক্কাবাসীকে নিজের দুশমনে পরিণত করেন, অতঃপর পুরো আরবের লোকদের দুশমনে পরিণত করেন, তারপর সকল আহলে কিতাবদের জন্য রসুল দাবি করে তাদের দুশমনে পরিণত করেন, তারপর পুরো খ্রিষ্টানদের রসুল দাবি করে তাদেরকে দুশমনে পরিণত করেন, তারপর পুরো দুনিয়ার মানুষের রাসুল দাবি করে তাদেরকেও দুশমনে পরিণত করেন। এটা মিথ্যা দাবিকারকের লক্ষণ হতে পারেনা, বরং সত্য দাবিকারকের লক্ষণ।
একইভাবে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ আঃ যখন ইমাম মাহদী দাবি করেন তখন পুরো মুসলিম উম্মাহ তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে ও তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেওয়া শুরু হয়। তারপর যখন তিনি বললেন যে, ”ঈসা মারা গেছেন ও যার আসার কথা ছিল ঈসা হিসেবে তিনি হলাম আমি” তখন পুরো ভারতবর্ষে বিরোধিতার আগুন লেগে যায়, যারা ইমাম মাহদী দাবি করার পর উনার সাথে ছিল তারাও দুশমনে পরিণত হয়। পাঞ্জাব তথা কাদিয়ান শিখদের ঘাঁটি ছিল, সেখানে বসে তিনি শিখদের গুরু নানকের ব্যাপারে দাবি করেন ও প্রমাণসহ দেখান যে গুরু নানক একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন এমনকি তিনি হজ্জ্বও করেছেন এবং গুরু নানক এর ভবিষ্য়দ্বাণী অনুযায়ী আগত ’এমেদ’ তিনি তখন শিখরাও উনার প্রচন্ড বিরোধীতা শুরু করে।
হিন্দুদের রাজত্ব পুরো ভারতবর্ষ। সেখানে বসে তিনি দাবি করেন, ”কৃষ্ণ এক খোদার অনুসারী ছিল এবং উনি যার আগমণের ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন তিনি আমিই”। তখন সারা ভারতবর্ষে তার বিরোধিতা তুমুল পর্যায়ে শুরু হয়ে যায় ও সকল হিন্দু ও আর্যরাও তার বিরোধি হয়ে যায়! বাকি ছিল বৌদ্ধরা। তিনি তাদের ব্যাপারে দাবি করেন যে, তাদের বুদ্ধ কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত ‘মৈত্রেয়’ তিনিই। শেষমেশ বৌদ্ধদেরও তিনি বিরোধীতে পরিণত করেন! এভাবে একের পর এক সারা ভারতবর্ষকে এভাবে শত্রুতে পরিণত করা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব যে হয় আল্লাহর পক্ষ হতে আগত সত্যবাদী নয়তো সে হয় পাগল! যদি পাগল হয় তবে লোকে তার কথায় কর্ণপাত করতো না কেননা, পাগলে কি না বলে! পাগল নিজের সম্পর্কে হাজারো দাবি করে, তাকে কেউ কিছু বলেনা। কিন্তু মির্যা সাহেব তা নন। বিরোধিতার সাথে দাবি বাড়ানো এই কথার প্রমাণ যে, সে সত্য দাবিকারক ও তাঁর দুনিয়ার প্রতিক্রিয়ার প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ নাই। হযরত মুহাম্মদ সাঃ সম্পর্কে খ্রিষ্টানদের দাবি এটাই ছিল যে, “দেখ! এই মিথ্যাবাদী লোক ধীরে ধীরে তার দাবিদাওয়া বৃদ্ধি করছে! একবারে সবকিছু দাবি করেনা কেন যদি সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী হয়ে থাকে?” রাসুলুল্লাহ সাঃ সম্পর্কে খ্রিষ্টানদের এই আপত্তি কি সত্য ছিল নাকি মিথ্যা? আশা করি, ধীরে ধীরে দাবি করাটা যে মিথ্যা হবার লক্ষণ নয় এটা সকলের বোধগম্য হয়েছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই সৌভাগ্য দিন। আমিন।
Leave a Reply