November 23, 2022, 2:30 am

Latest Post:
হযরত উমর (রা.)-এর পবিত্রময় স্মৃতিচারণ হযরত আবু উবায়দা বিন জাররাহ্ (রা.)-এর পবিত্রময় স্মৃতিচারণের বাকী অংশ মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবী হযরত আবু উবায়দা বিন জাররাহ্ (রা.)-এর পবিত্রময় স্মৃতিচারণ মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবী হযরত বিলাল (রা.)-এর পবিত্রময় স্মৃতিচারণের ধারাবাহিকতা মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবী হযরত বিলাল (রা.)-এর পবিত্রময় স্মৃতিচারণ মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবীদের (রা.) ধারাবাহিক পবিত্রময় স্মৃতিচারণ মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবীদের (রা.) ধারাবাহিক পবিত্রময় স্মৃতিচারণ শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যকার মতভেদের মীমাংসায় যুগ ইমাম আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধানের সাথে দু’টি ভার্চুয়াল সভার সম্মান লাভ করলো লাজনা ইমাইল্লাহ্ হল্যান্ড মহানবী (সা.)-এর বদরী সাহাবীদের (রা.) ধারাবাহিক পবিত্রময় স্মৃতিচারণ
ন্যায়-বিচারক মীমাংসাকারী প্রতিশ্রুত মসীহ

ন্যায়-বিচারক মীমাংসাকারী প্রতিশ্রুত মসীহ

হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত :

حدثنا إسحاق أخبرنا يعقوب بن إبراهيم حدثنا أبي عن صالح عن ابن شهاب أن سعيد بن المسيب سمع أبا هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم والذي نفسي بيده ليوشكن أن ينزل فيكم ابن مريم حكما عدلا فيكسر الصليب ويقتل الخنزير ويضع الجزية ويفيض المال حتى لا يقبله أحد حتى تكون السجدة الواحدة خيرا من الدنيا وما فيها ثم يقول أبو هريرة واقرءوا إن شئتم وإن من أهل الكتاب إلا ليؤمنن به قبل موته ويوم القيامة يكون عليهم شهيدا

অর্থ: ”আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, হযরত রসূলে করীম (সা:)বলিয়াছেন, যাহার আয়ত্তাধীনে আমার প্রাণ আমি তাহার শপথ করিয়া বলিতেছি, অচিরে তোমাদের মধ্যে ইবনে-মরিয়ম নাজেল হইবেন ন্যায়-বিচারক মীমাংসাকারীরুপে, তৎপর তিনি শূকর হত্যা করিবেন, জিজিয়া কর উঠাইয়া দিবেন, এমনভাবে মাল দান করিবেন যাহা কেহই গ্রহণ করিতে পারিবে না, এমনকি একটি সেজদা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যস্থিত সকল বস্তু হইতে উৎকৃষ্ট হইবে। তৎপর হযরত আবু হুরায়রা বলিলেন, তোমরা ইচ্ছা করিলে কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করিতে পার, – “প্রত্যেক আহলে কিতাব ইহা বিশ্বাস করিবে তাহার মৃত্যুর পূর্বে এবং তিনি কিয়ামতের দিনে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন।

(বুখারী শরীফ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব-নুযুলে ঈসা ইবনে মরিয়ম, হাদীস নং- ৩২৬৪)

হাদীসে বর্ণিত প্রতিশ্রুত মসীহের প্রথম কাজ ন্যায়-বিচারক মীমাংসাকারী।

মসীহ মাওউদের প্রথম কাজ ন্যায় বিচারক হিসাবে অভ্যন্তরীণ অনৈক্যসমূহের মীমাংসা করা। সুতরাং এ সম্বন্ধে জানা কর্তব্য, বর্তমান যুগে উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে বহু প্রকার অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য বিদ্যমান। যথাঃ-

(১) খােদাতা’আলার গুণাবলী (সীফাত) সম্বন্ধে মতবিরােধ।

(২) মালায়েকা বাঁ ফেরেশতাগণ সম্বন্ধে এখতেলাফ।

(৩) সেলসেলা রেসালত সংক্রান্ত মতানৈক্য।

(৪) মৃত্যুর পর জীবন, আমলের ভাল-মন্দ প্রতিফল, এবং বেহেশত-দোযখ সম্বন্ধে মতভেদ।

(৫) তকদীরের বিষয়ে মতভেদ।

(৬) কোরআন ও হাদীসের মর্যাদা সম্বন্ধে মতবিরােধ।

(৮) আহলে হাদীস এবং আহলে ফেকাহ্ লইয়া মতবিরােধ।

(৯) জ্ঞানমূলক ধর্ম-বিষয়সমুহের মতবিরােধ।

(১০) ফেকাহর মাসায়েল সম্বন্ধে অনৈক্য।

• এই দশ প্রকার মতবিরােধ বর্তমান যুগে ইসলামী দুনিয়ায় এক প্রকার ভীষণাকৃতি আঁধারের আয়ােজন করিয়াছিল। আত্ম-কলহ ব্যতীত এই সকল বিরােধের ফলে মােসলমানগণের মধ্যে এরূপ বিষয়সমূহের উদ্ভব হইয়াছিল যে, তদ্বারা ইসলামের বদনাম হইয়াছিল। শক্ররা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান করিবার মহা সুযােগ লাভ করে। কোন কোন বুদ্ধিমান মােসলমান ইহাতে নাচার হইয়া মুক্তির উপায়ের অভাবে ইসলামের অবস্থার প্রতি অশ্রুপাত করিতেছিলেন, এবং কোন কোন দুর্বল ঈমানের মােসলমানতে ইসলামকে বিদায় দিতেছিলেন। এইরূপ তুমুল দুঃসময়ে আল্লাহতাআলা তাঁহার ওয়াদা অনুসারে হযরত মির্যা সাহেবকে “হাকাম আদাল” ন্যায় বিচারক ও মীমাংসা কারীরূপে আবির্ভূত করেন। তিনি আসিয়াই শ্বেত-পতাকা উত্তোলন করেন এবং ঘােষণা করেন যে, “আসাে এখানে, খােদা আমাকে তােমাদের মতবিরােধের মীমাংসাকারকরূপে পাঠাইয়াছেন। আসাে, আমি তােমাদের সত্য-সত্য মীমাংসা করিব।” অতঃপর তিনি বিচারকের আসন গ্রহণ করেন এবং আধ্যাত্মিক বিচার আরম্ভ করেন।

সর্বপ্রধান মতবিরােধ ছিল, সাধারণভাবে মােসলমানদের মধ্যে এই ধারণা বিস্তার লাভ করে যে, খােদা পূর্বকালে অবশ্য আপন বান্দাগণের সহিত কথা বলিতেন, কিন্তু এখন তিনি তা করেন না। অন্য কথায়, তিনি শােনেন, কিন্তু কথা বলেন না। মসীহ্ মাওউদ (আঃ) আসিয়া মীমাংসা জানাইলেন, “ধর্ম-পুস্তকীয় ও যৌক্তিক উপায়ে অকাট্য প্রমাণ-সমূহ দ্বারা প্রদর্শন করিলেন যে, খােদা সম্বন্ধে এইপ্রকার ধারণা পােষণ করা ভীষণ ‘এলহাদ’-(ধর্মহীনতা)। ইহা খােদাতা’আলার উপর ভীষণ দোষারােপ এবং তাঁহার গুণাবলীর উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ। খােদাতাআলার কথা বলার শক্তি বাতেল হয় নাই। তিনি বলিলেন যে, খােদা কালাম না করিলে ইসলামও মৃত ধর্মসমূহেরই অন্তর্ভুক্ত হইয়া পড়ে। ইহার ভিত্তিও অপরাপর ধর্মের ন্যায় শুধু কেচ্ছা-কাহিনীর উপরেই আসিয়া সংস্থাপিত হয়। ইহাতে কোন সত্যিকার প্রেমিক বা কোন প্রকৃত অন্বেষকের পিপাসা কখনাে মিটিতে পারে না, তিনি প্রমাণ করিলেন যে, ইসলাম, কোরআন শরীফ এবং রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম সর্বদাই সুমিষ্ট ফল প্রদান করিয়া আসিতেছেন। কোরআন মজীদের বাণী “লাহুমুল বুশরা ফিল হায়াতে দুনয়্যা” (তাহাদের জন্য ইহলৌকিক জীবনেই সুসংবাদ) অনুসারে সেই সুমিষ্ট ফল ইহাই যে, তাঁহাদের প্রকৃত আজ্ঞানুবর্তী খােদাতা’আলার সহিত সাক্ষাত সম্বন্ধ স্থাপনের পরম সৌভাগ্য লাভ করে-সে তাহার ক্ষমতানুযায়ী খােদাতা’আলার বাক্য লাভে অনুপ্রাণিত হয়। তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা এই বিষয়টি উজ্জ্বল দিবালােকের ন্যায় প্রস্ফুটিত করিলেন (তাঁহার রচিত বারাহীনে আহমদীয়া, নুসরাতুল-হক’, ‘নফ্লুমসীহু’, ‘হকীকতুল ওহী’ প্রভৃতি গ্রন্থ দেখুন)।

তারপর, খােদাতাআলার সম্বন্ধে এই মতানৈক্য ছিল; খােদাতলা কাহারাে সম্বন্ধে ‘আযাব’ দেওয়ার মীমাংসা না করা পর্যন্ত, তাহার প্রতি অবশ্য রহমত নাযেল করিতে পারেন, কিন্তু আযাব দেওয়ার ফয়সালার পর তৌবা, ইস্তেগফার: করিলেও আযাবের ফয়সালা পরিবর্তনপূর্বক তিনি রহমত নাযেল করিতে পারেন না। তিনি তাঁহার পূর্ব ফয়সালা অনুযায়ী কার্য করিতে বাধ্য। এইসব ধারণা হইতে আমরা খােদার পানাহ্ চাই। হযরত মির্যা সাহেব এ বিষয়টিও যুক্তি দ্বারা-পরিষ্কার করিলেন ও প্রমাণ করিলেন যে,”এই বিশ্বাসটি সত্য নয় : খােদাতা’আলার কামেল কুদরত, তাহার অসীম শক্তি তাহার অপরিসীম দয়া-তাহার অপার রহমতের বিরােধী নহে-খােদাতালা বলেন, ওয়াল্লাহু গালেরুন আলা আমরিহী’ (‘আল্লাহতা’লা তাঁহার মীমাংসা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব রাখেন’ -সূরাহ ইউসুফ) (‘আনওয়ারুল ইসলাম, আঞ্জামে-আথাম’, নযুলুল-মসীহ্, হকীকতুল-ওহী’, প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, খােদাতা’লা সম্বন্ধে এই মতবিরােধও ছিল যে, তিনি বনী-ইসরাঈল এবং বনী ইসমাঈল ব্যতীত আর কোন উম্মতে রসূল পাঠান নাই, এবং তাহার অনুগ্রহের জন্য শুধু এই দুইটি গােষ্ঠীকেই মনােনীত করিয়াছলেন। হয়রত মির্যা সাহেব যুক্তি দ্বারা এই ধারণা ভ্রান্ত হওয়া প্রমাণ করেন। ধর্মীয় গ্রন্থমূলক এবং বিশুদ্ধ যৌক্তিকতামূলক প্রমাণাদি দ্বারা তিনি, প্রদর্শন করেন যে, প্রত্যেক উম্মতই খােদাতা’আলার সহিত বাক্যালাপের সুযােগ প্রাইয়াছে এবং প্রত্যেক উম্মতেই তাঁহার রসূল আসিয়াছেন। যেমন কুরআন করীম বলে, “ওইম্মি উম্মাতিন ইল্লা খালা ফিহা নাযীর” (এমন কোন জাতি নাই যে, উহার মধ্যে সতর্ককারী, হন নাই।) তিনি হিন্দুদের কৃষ্ণ, বৌদ্ধদের গৌতম বুদ্ধ, পারসিকগণের জরযুস্ত্র এবং চীনবাসীগণের কফিউসিয়াসের রেসালত স্বীকারপূর্বক আন্তর্জাতিক -সম্বন্ধসূচক যুগান্তরের আয়ােজন করেন (চশমায়ে মারেফাত’ পয়গামে সােলেহ’ প্রভৃতি দ্রষ্টব্য)

তারপর,“খােদাতাআলার এলহাম সম্বন্ধে মতানৈক্য ছিল। এলহাম সম্বন্ধে বলা হইত যে, শাব্দিক এলহাম হয় না। শুধু একটা ভাব মনে উদ্রেক হয় মাত্র। অন্য কথায়, ভাল বা মন্দ যে সকল ভাব মনে জাগে সকলই এলহাম। হযরত মির্যা সাহেব এই ধারণাকে ভ্রান্ত বলিয়া প্রমাণিত করেন। কোরআনের শিক্ষা এবং যৌক্তিকতা ও অভিজ্ঞতা বলে তিনি প্রমাণ করিলেন যে, যদিও প্রচ্ছন্ন ওহী,-“ওহী-খফী”ও এক প্রকার কালামে এলাহি’ (আল্লাহর বাণী); কি অধিকতর উচ্চ ও অধিকতর নিরাপদ ও সুরক্ষিত কালাম’ (ঐশীবাণী) “শাব্দিক উপায়ে’’ নাযেল হয়। কোরআন করীমের ওহীও এই শ্রেণীরই অন্তর্গত। (‘বারাহীনে আহমদীয়া’ নযুলুল-মসীহ্ প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, খােদাতা’আলার দোয়া কবুল করিবার গুণ সম্বন্ধে মতভেদ ছিল। বলা হইত যে, দোয়া একটি এবাদত মাত্র। দোয়ার ফলে খােদাতা’আলা তাঁহার ফয়সালা বা এরাদা-তাহার সংকল্প বা মীমাংসা কখনাে পরিবর্তন করেন না। হযরত মির্যা সাহেব এই ধারণাকে প্রবল যুক্তি-প্রমাণের দ্বারা ভ্রান্ত বলিয়া প্রমাণিত করেন। কোরআনের শিক্ষা, প্রত্যক্ষ ঘটনাবলী ও অভিজ্ঞতা মূলে সুনিশ্চিত প্রমাণের বলে উল্লিখিত ধারণার অসারত তিনি প্রকাশ করেন (আয়নায়ে-কামালাতে-ইসলাম, বারাকাতুদ্-দোয়া প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, খােদাতা’আলার সত্তা সম্বন্ধে মতভেদ ছিল। বলা হইত যে, তিনি যেন তাঁহার কোন কোন এখতিয়ার (অধিকার) তাঁহার কোন কোন বান্দার হস্তে সমর্পণ করেন এবং তাঁহারাও স্বতন্ত্রভাবে খােদার মতই কুদরত’ (ঐশী-শক্তি) প্রদর্শন করিতে থাকেন। এই ধারণার ফলে ইসলামে বহু মিথ্যা গল্প-গুজবের সৃষ্টি হইয়াছে। হযরত মির্যা সাহেব যুক্তি- প্রমাণের সাহায্যে ইহা ভ্রান্ত হওয়া প্রমাণ করিয়াছেন।

তারপর, খােদাতাআলার পরেই মালায়েকা’, (ফেরেশতাগণ), সম্বন্ধে বহু প্রকার মতভেদ ছিল। তাঁহারা কীরূপ? তাঁহাদের কাজ কী? তাঁহারা কীরূপে কাজ করেন? তাঁহাদের প্রয়ােজনীয়তা কী? প্রভৃতি, প্রভৃতি। হযরত মির্যা সাহেব অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ গবেষণা দ্বারা এই সকল সূক্ষ্ম বিষয়ের উপর আলােকপাত করেন এবং এই মসলা সম্বন্ধে সত্য পথের সন্ধান দেন (তৌষীহে-মরাম’, আয়নায়ে-কামালাতে ইসলাম’, এবং হযরত খলীফাতুল-মসীহ্ সানী প্রণীত “মালায়েকাতুল্লাহ্ প্রভৃতি দ্রষ্টব্য)।

তারপর, সেলসেলা- রেসালত সম্বন্ধে মতভেদ ছিল। বলা হইত যে, আঁ হযরত সল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের উপর সকল প্রকার নবুওয়ত “খতম’’ হইয়াছে। এখন কোন ব্যক্তি তাহারই “ফয়েয’-তাঁহারই আশীষপ্রাপ্ত এবং তাঁহারুই শরীয়তের খাদেম হইলেও নবী হইতে পারে না। হযরত মির্যা সাহেব-প্রবল যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন যে, ‘খাতামুন্নাবিয়ীন’ অর্থ যাহা মনে করা হয়, তাহা নয়। নবুওয়তের সেলসেলা বন্ধ হওয়ার এই অর্থ নয় যে, এখন কোন প্রকার নবীই আসিতে পারেন না। কারণ, আঁ হযরত সল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের পর শুধু শরীয়তরাহী নবুওয়তের দ্বার রুদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু শরীয়তবিহীন, প্রতিবিম্বকার -“গয়ের-শরিয়ী”, যিল্লি নবুওয়তের দ্বার রুদ্ধ হয় নাই। যদি নবুওয়তের যাবতীয় বিভাগ বন্ধ এবং কর্তিত হইয়া থাকে, তবে ইহার অর্থ- নাউযুবিল্লাহ’ -রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের অস্তিত্বের ফলে, উম্মতে মােহাম্মদীয়া একটি অতি গৌরবময় মহাকৃপা ও ঐশী পুরস্কার হইতে কাটা গিয়াছে। বস্তুতঃ তিনি ধর্ম-গ্রন্থীয় প্রমাণ ও বিশুদ্ধ যুক্তি দ্বারা এই মসলার অসারতা প্রমাণ করেন (এক গলতি কা এজালা’, তােহফা গােলড়বিয়া’, ‘নযুলুল-মসীহ’, ‘হাকীকাতুল-ওহী’ প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, নবী ও রসূলগণ সম্বন্ধে একটি সাংঘাতিক মতভেদ ছিল, সকল নবীই প্রকারান্তরে গােনাহ্গার। ‘হযরত ঈসা (আঃ) ব্যতীত কোন নবীই মাসুম’ (নিম্পাপ) নহেন। একমাত্র তাঁহাকেই শয়তান স্পর্শ করে নাই। তিনি ব্যতীত অন্য কোন নবীই শয়তানের স্পর্শ হইতে পবিত্র নহেন। হযরত মির্যা সাহেব শক্তিশালী যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে এই ধারণা ভ্রান্ত হওয়া প্রমাণ করিয়াছেন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী বিষয়াবলী লিপিবদ্ধ করিয়া ইহার প্রকৃত তত্ত্ব উদঘাটন করিয়াছেন (নূরুল্-কোরআন, ‘রিভিও অ রিলিজিয়ন্স’ পত্রে ইসমতে আম্বিয়া সংক্রান্ত তাঁহার প্রবন্ধাবলী ইত্যাদি দেখুন)। তারপর, নবুওয়তের অর্থ, নবী এবং নবুওয়তের মোকাম দ্বারা কী বুঝায়? অনুরূপ প্রশ্নাবলী সম্বন্ধেও যে সকল ভ্রান্ত ধারণা স্থান পাইয়াছিল তাহাও হযরত মির্যা সাহেব পরিষ্কার করিয়াছেন (হাকীকাতুল-ওহী’ প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, মৃত্যুর পরপারের জীবন, বেহেশত, দোযখ, শাস্তি ও পুরস্কার সম্বন্ধে বহু আজগুবী ধারণা প্রচলিত হইয়াছিল। ফলে অন্যদের পক্ষে ইসলামের উপর হামলা করিবার মহা সুযােগ উপস্থিত হইয়াছিল। বেহেশত ও দোয়খের স্বরূপ (হকীকত) সম্বন্ধে যে সকল ধারণা প্রকাশ করা হইত, হযরত মির্যা সাহেব এ সম্বন্ধে অতি হৃদয়গ্রাহী, সরস ও সূক্ষ্মতত্ত্বপূর্ণ যুক্তিযুক্ত বিষয়াদি লিখেন এবং কোরআন এবং হাদীস হইতে প্রকৃত তত্ত্বসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা করেন। ফলে পূর্বে যে সকল শত্রু আক্রমণ করিত, তাহারাও উচ্চ প্রশংসা করিতে আরম্ভ করে (ইসলামী উসুল কি ফিলাসফি’ প্রভৃতি দেখুন)।

‘তকদীর’ যাবতীয় মতানৈক্যের কেন্দ্র ছিল। ইহার সম্বন্ধে মতভেদের সীমা-পরিসীমা ছিল না। তিনি ইহাকে এরূপ পরিষ্কার করিয়া বুঝাইলেন যে, এখন একজন বালকও তাহা বুঝিতে পারে এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন পুস্তকে খণ্ড খণ্ডভাবে আলােচনা করিয়াছেন।

খেলাফতে রাশেদা সম্বন্ধে সুন্নী-শিয়া মতবিরােধ অতি প্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত। তিনি ইহার সত্যাসত্য মীমাংসা করিয়াছেন (সিরুল খােলাফা’, ‘হুজ্জাতুল্লাহ’ প্রভৃতি এবং হযরত মির্যা সাহেবের সাহাবী মৌলবী আব্দুল করীম (রাঃ) কৃত “খেলাফতে রাশেদা” দেখুন)।

কোরআন ও হাদীসের মরতবা সম্বন্ধে অর্থাৎ ইহাদের মধ্যে কোনটি অপরটির উপর বিচারপতিত্ব করিবে, তৎসম্বন্ধে এই প্রকার মতাবলী প্রকাশ করা হইত যে, শুনিলে একজন মুসলমানের দেহে রােমাঞ্চ হয়। মুসলমানদের এক ‘ফেরকা’ কোরআন শরীফকে পিছনে ফেলিয়া হাদীসের প্রতি ঝুঁকিয়াছে। হযরত মির্যা সাহেব এই সকল বিষয়ের অত্যন্ত সূক্ষ্ম সমালােচনা করিয়াছেন এবং সুন্নাহকে হাদীস হইতে পৃথক হওয়া প্রমাণ করিয়াছেন। কোরআন, সুন্নাহ্ ও হাদীসের পৃথক পৃথক মর্যাদা যুক্তি-প্রমাণের দ্বারা তিনি সংস্থাপন করিয়াছেন (আল্ হক লুধিয়ানা’, ‘রিভিয়ু বর মােরাহাসা চোক্রলবী’, ‘কিতিয়ে-নূহ’, প্রভৃতি দেখুন)

‘আহলে-ফেকাহ্’ ও ‘আহলে হাদীসদের পারস্পরিক মতবিরােধ ও দ্বন্দ্ব অতি পরিচিত। হযরত মির্যা সাহেব যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা পক্ষগণকে তাহাদের ভ্রান্তি সম্বন্ধে সতর্ক করেন। উভয় সম্প্রদায়ের দোষ-গুণের সমালােচনা করেন এবং উভয়ের বাড়াবাড়ি হইতে মধ্য-পন্থা অবলম্বন করেন (ফতওয়া আহমদীয়া’ প্রভৃতি দেখুন)

তারপর মােজেযাসমূহের হকীকত (প্রকৃত তত্ত্ব) এবং ঐশী-নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে ‘আহলেহাদীস নেচারী’ (প্রকৃতিবাদী) এবং হানাফীদের মতভেদের সীমা ছিল না। হযরত মির্যা সাহেব এ বিষয়ে, পূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। তাহাদের মতভেদের আর কোনই ঠাই রাখা হয় নাই (সুরমা-চশমে-আরিয়া, বারাহীনে-আহমদীয়া, চশমায়েমারেফাত, হাকীকাতুল,-ওহী, প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, ‘জেহাদ’ সমস্যা সাংঘাতিক রূপ ধারণ করিয়াছিল। ইহা ইসলামের উপর এক দুরপনেয় কলঙ্ক আনিতেছিল। হযরত মির্যা সাহেব যুক্তি-প্রমাণের উজ্জ্বল আলােকে ইহাদের সমাধান এবং কোরআন শরীফে বর্ণিত স্পষ্ট নীতি ‘লা ইকরাহা ফিদ্দীন’ (-ধর্মে কোনাে বলপ্রয়ােগ নাই’) অনুযায়ী সত্য পথ প্রদর্শন করেন (‘রেসালাহ্ জেহাদ’, ‘হাকীকাতুল- মাহ্দী, চশমায়ে-মারেফাত, জঙ্গে মােকাদ্দাস, প্রভৃতি দেখুন)।

তারপর, আম্বিয়া আলায়হেমুস সালাম কর্তৃক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সংবাদ লাভ এবং ইহার নিগূঢ় তত্ত্বাবলী সংক্রান্ত মসলা ঘাের অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। হযরত মির্যা সাহেবের বক্তৃতা ও লেখার ফলে এখানেও সূর্যের উদয় হইল (আঞ্জামে-আথম’, ‘আন্ওয়ারুল্-ইলাম, ‘হকীকাতুল-ওহী’ প্রভৃতি দ্রষ্টব্য)

তারপর, ফেকাহর মসলাগুলিতে অনৈক্যের অন্ত ছিল না। হযরত মির্যা সাহেব কোন কোন অমৌলিক মতভেদ থাকিতে দেন এবং ইহাকে উম্মতের জন্য রহমতস্বরূপ নির্ধারণ করেন এবং কোন কোন স্থলে যুক্তি দ্বারা যথার্থ পথ প্রদর্শন করেন (তাহার ‘ডাইরী, ফাতাওয়া আহমদীয়া’ প্রভৃতি দেখুন)। মুসলমানদের মধ্যে যে সকল মতানৈক্য দেখা দিয়াছিল, এবং হযরত মির্যা সাহেব ‘হাকাম বা বিচারকরূপে যেগুলির মীমাংসা করেন, তন্মধ্যে কতকগুলি সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা গেল। যদি উম্মতের এখতেলাফসমূহের পূর্ণ বিবরণ এবং হযরত মির্যা সাহেবের মীমাংসাবলীর সম্পূর্ণ উল্লেখ করিতে হয়, তবে এক বিরাট গ্রন্থ হইয়া পড়িবে। তজ্জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ কতিপয় স্কুল মতভেদ উল্লেখ করা হইল।

এস্থলে যদি কেহ এই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, “মতভেদ সম্বন্ধে তো সমস্ত উলামাই তাঁহাদের অভিমত প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন, হযরত মির্যা সাহেব অধিক কি করিলেন?”, তবে ইহা একটি নিরর্থক সন্দেহ করা হইবে। কারণ, অভিমত প্রকাশ এক কথা, আর বিচারক (হাকাম’) হইয়া কোন বিষয়ের মীমাংসা করা অন্য কথা। কোন বালক অভিমত প্রকাশ করিতে পারে। কিন্তু হযরত মির্যা সাহেব যেভাবে উম্মতের এখতেলাফসমূহের মীমাংসা করিয়াছেন, উহাতে কতকগুলি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। তদ্বারা তাঁহার ‘হাকাম’ (প্রত্যাদিষ্ট বিচারক) হওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আলােকপাত হয়। ঐসকল বিশেষত্ব এইঃ

(১) তিনি কোন বিষয়ে কোন দলের পক্ষাবলম্বনপূর্বক কোন অভিমত দেন নাই। সর্বদাই তিনি একজন সালিস, একজন বিচারকরূপে মীমাংসা দিয়াছেন। এইজন্য তাঁহার মীমাংসাসমূহ কাহারো অধিকার হরণের বিষক্রিয়া হইতে সর্বতােভাবে পবিত্র। ইহা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব। তাঁহার মীমাংসাবলী বিচার করিলে প্রত্যেকেই স্বীকার করিতে বাধ্য যে, তিনি প্রত্যেক মীমাংসাই ন্যায়ের সহিত বিনা পক্ষাবলম্বনে প্রদান করেন।

(২) তিনি শুধু অভিমতই প্রকাশ করেন নাই, বিশুদ্ধ যুক্তি ও ধর্ম পুস্তকীয় প্রমাণ, উভয় দিক হইতেই, যেন সূর্য আনিয়া দিয়াছেন। তিনি একজন সত্যান্বেষীর জন্য অনৈক্যের কোন পথ রাখেন নাই। যে বিষয়েই কলম ধরিয়াছেন সবসময়ের জন্য উহার মীমাংসা করিয়া দিয়াছেন। পর্বতের ন্যায় তাঁহার কোন লেখাই টলানাে যায় না। একদর্শিতা-শূন্য ব্যক্তি মাত্রই তাঁহার লেখার অকাট্যতা স্বীকার না করিয়া পারে না। তিনি প্রত্যেক মীমাংসারই যে সূত্র বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাতে অস্বীকারকারীর পলায়নের কোন সুযােগ নাই।

(৩) তিনি অলৌকিক শক্তি এবং খােদায়ী নিদর্শনসমূহের বলে তাহার প্রত্যেক কথার সত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। অর্থাৎ শুধু ধর্মগ্রন্থীয় প্রমাণ ও বিশুদ্ধ যুক্তি দ্বারাই তিনি তাঁহার কথা প্রমাণিত করেন নাই, বরং অস্বীকারকারীর বিরােধিতার বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্যের নিদর্শন প্রদর্শনের দ্বারা তাঁহার মীমাংসাবলীর উপর খােদায়ী সমর্থনের মোহর স্থাপন করিয়াছেন। সুতরাং কোথায় এই মীমাংসা আর কোথায় বেচারা মৌলবীদের বহস, তাঁহাদের সমালােচনা!

“চে নিস্বত খা রা বা আলুমে পাক!” পবিত্র ‘স্বর্গ-জগতের সহিত মাটির কি সম্বন্ধ!

মূল- “তবলীগে হেদায়াত” পুস্তক হতে সংকলিত

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




This site is not the official site of Ahmadiyya Muslim Jamat. This site has been created by a follower of Hazrat Imam Mahdi (PBUH) only for share the message of Mahdi(pbuh)
আহমদীয়া মুসলিম জামাত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Alislam.org